বাল্যবিবাহ আমাদের দেশে এক ধরনের সামাজিক অনাচার বলা যায়, এজন্য যে-বাল্যবিবাহের কারণে একটি কিশোরী মানসিকভাবে বিকাশ লাভ করতে পারে না। কম বয়সে মা হওয়ার কারণে সে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে। আবার তার গর্ভের নবজাত শিশুর জীবনও হুমকির মধ্যে পড়ে। এর ফলে দেশে মা ও নবজাত শিশুর মৃত্যুহার বৃদ্ধি পায়।এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের কারণে ২০ শতাংশ মেয়ে ১৫ বছর বয়সের আগেই গর্ভবতী হয়। আর এজন্য মা এবং শিশু যেসব মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে তা হলো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়া ও কম ওজনের শিশুর জন্ম দেয়া, আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রসবের সময় মা ও সন্তান দু’জনেরই মৃত্যুর আশংকা থাকে। প্রতি বছর গর্ভধারণ ও প্রসবকালীন জটিলতার কারণে কমপক্ষে ৬০ হাজার কিশোরী মা মৃত্যুবরণ করে। সাধারনত: বাল্য গর্ভধারণ, কিশোরী মায়েদের পুষ্টিহীনতা, রক্ত স্বল্পতা, সুচিকিৎসার অভাব প্রভৃতি কারণে তাদের নিরাপদে মা হওয়ার স্বপ্ন, দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। তাই মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু রোধ করতে হলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরো সোচ্চার হতে হবে। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার মাতৃমৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি লাখে ২৯০ থেকে নামিয়ে ২০২০ সালের মধ্যে ১৪৩ জনে নামিয়ে আনা এবং নবজাতকের মৃত্যু প্রতি হাজারে ৩৭ থেকে ২১ জনে নামিয়ে আনার কাজ করে যাচ্ছে। দেশে প্রসবজনিত কারণে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়েও নানান উদ্যোগ রয়েছে। এতে অনেকটা সফলতাও এসেছে। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ প্রশংসিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সফলতা আসায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছে। মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে পিতা-মাতা, স্বামী এবং অভিভাবকদের সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষ করে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে তাদের আরো সচেতন হতে হবে।
একথা সত্য যে, বাল্যবিবাহ সংকুচিত করে দেয় নারীর পৃথিবী। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত বাল্যবিবাহ চলছে। কোনো কোনো অভিভাবক বাল্যবিবাহের পরিণতি না জেনে বিয়ে দিচ্ছেন কিশোরী মেয়েকে । আবার কেউ কেউ আইন জেনেও আইনের বিধি-নিষেধ পাশ কেটে কিশোরী মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন। এই বাল্যবিবাহের কারণে জাতি তথা দেশের মারাত্মক ক্ষত হচ্ছে। কেননা, এই বাল্যবিবাহের কারণে দেশে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাল্যবিবাহের প্রতিরোধে নারী নিজেই সচেতন হয়ে উঠলে এবং তার সঙ্গে আমাদের সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্র্র এ বিষয়ে জোরালো পদপে নিলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এতে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে। একজন সুস্থ সবল মা সুস্থ সন্তানের জন্ম দেবে, গড়ে উঠবে সুস্থ একটি জাতি।

